জয় দিয়েই হামজা চৌধুরীর শেফিল্ড অধ্যায় শুরু
পালস নিউজ বিডি :
ফেরার জন্য এর চেয়ে নাটকীয় রাত আর কী হতে পারত! শেফিল্ড ইউনাইটেডে স্থায়ীভাবে যোগ দেওয়ার মাত্র এক দিন পরই মাঠে নেমে পড়লেন হামজা চৌধুরী। শুধু মাঠে নামাই নয়, সরাসরি জায়গা করে নিলেন প্রথম একাদশে। আর তার প্রত্যাবর্তনের রাতেই ব্র্যামল লেনে পাঁচ গোলের রোমাঞ্চকর লড়াই শেষে বোল্টন ওয়ান্ডারার্সকে ৩-২ গোলে হারিয়ে মৌসুমের প্রথম জয় পেল শেফিল্ড ইউনাইটেড।
হামজার জন্য রাতটি অবশ্য শুরু হয়েছিল অস্বস্তি দিয়ে। যেন এক ম্যাচে দুই ছবি! ম্যাচের প্রথম মিনিটেই বাঁ প্রান্ত দিয়ে উঠে আসা বোল্টনের থিয়েরি গ্যালেকে আটকাতে পারেননি তিনি। হামজাকে সামনে রেখেই ক্রস করেন গ্যালে। শেফিল্ডের এক খেলোয়াড় সেই বল ঠেকালেও ফিরতি বলে গোল করেন জাভিয়ের সিমন্স। গোলটি সরাসরি হামজার ভুলের ফল-এমনটা বলার সুযোগ নেই। তবে তার সামনে থাকা ক্রসটি আরও ভালোভাবে ঠেকাতে পারলে গোলের পরিস্থিতিই হয়তো তৈরি হতো না!
এই গোলের মধ্য দিয়ে ম্যাচটি বাংলাদেশের সমর্থকদের কাছেও পেয়েছিল আলাদা মাত্রা। একদিকে বাংলাদেশের জাতীয় দলের মহাতারকা হামজা চৌধুরী, অন্যদিকে বোল্টনের শ্রীলঙ্কান বংশোদ্ভূত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার জাভিয়ের সিমন্স। ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচটি তাই অনেক বাংলাদেশি দর্শকের চোখে হয়ে উঠেছিল এক ধরনের ‘লঙ্কা-বাংলা’ লড়াই।
শুরুর ধাক্কা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। মাত্র তিন মিনিট পরই জাফেট ট্যানগ্যাঙ্গার গোলে সমতায় ফেরে শেফিল্ড। এরপর ম্যাচে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের গতি বাড়তে থাকে। হামজাও ধীরে ধীরে নিজের ছন্দ খুঁজে নেন।
পরিসংখ্যান অন্তত সেই গল্পই বলছে। পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকা হামজা ৫০টি পাসের মধ্যে ৪৫টি সফলভাবে সতীর্থদের কাছে পৌঁছে দেন। তার পাসিং অ্যাকুরেসি ছিল ৯০ শতাংশ। রক্ষণেও ছিলেন কার্যকর। নেওয়া চারটি ট্যাকলের চারটিতেই সফল হয়েছেন তিনি। অর্থাৎ প্রথম মিনিটের সেই অস্বস্তিকর মুহূর্তের পর ম্যাচ যত গড়িয়েছে, ততই নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন বাংলাদেশের এই ফুটবলার।
তবে সবকিছু নিখুঁত ছিল না। রাইটব্যাক পজিশনে খেলা হামজা বিরতির আগে গোলের একটি বড় সুযোগও নষ্ট করেন। তার পারফরম্যান্স তাই নিখাদ উজ্জ্বলতার গল্প হয়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য স্টার-এর মূল্যায়নে, ম্যাচে হামজা পুরোপুরি থিতু হতে পারেননি এবং রাইটব্যাক পজিশনেও তাকে স্বচ্ছন্দ মনে হয়নি।
কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য এখানেই-একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের চেয়েও কখনো কখনো বড় হয়ে ওঠে দলের ফল। আর শেফিল্ডের জন্য সেই ফলটি ছিল দারুণ।
দ্বিতীয়ার্ধে ম্যাচ আবার উত্তেজনার কেন্দ্রে ফিরে আসে। ৬৭ মিনিটে স্যাম ডালবির গোলে বোল্টন ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। শেফিল্ডের সামনে তখন আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর পরীক্ষা। সেই পরীক্ষার উত্তর দিতে তাদের সময় লাগল মাত্র এক মিনিট। ৬৮ মিনিটে প্যাট্রিক বামফোর্ড গোল করে আবারও সমতায় ফেরান স্বাগতিকদের।
ম্যাচ তখন এগোচ্ছিল ড্রয়ের দিকে। কিন্তু ব্র্যামল লেনের রাত তখনও শেষ হয়নি। যোগ করা সময়ের তৃতীয় মিনিটে বদলি খেলোয়াড় রোমেল ডোনোভান এমন এক গোল করলেন, যা পুরো স্টেডিয়ামকে মুহূর্তেই উৎসবে পরিণত করে। ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে শেফিল্ড ইউনাইটেড।
আর সেই জয়ের সাক্ষী হলেন হামজা-শুধু দর্শক হিসেবে নয়, ৯০ মিনিট মাঠে থেকে। একদিন আগেই যে ক্লাবের সঙ্গে তার সম্পর্ক স্থায়ী হয়েছে, সেই ক্লাবের জার্সিতে ফেরার রাতেই পেলেন জয়। গত মৌসুমে ধারে শেফিল্ডে এসে ১৯ ম্যাচ খেলেছিলেন হামজা। তার উপস্থিতি দলটিকে চ্যাম্পিয়নশিপের প্লে-অফ ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু ফাইনালে সান্দারল্যান্ডের কাছে হেরে প্রিমিয়ার লিগে ফেরা হয়নি শেফিল্ডের।
এবার তাই নতুন মৌসুম, নতুন লক্ষ্য। আর সেই লক্ষ্যে হামজাকেও স্থায়ীভাবে নিজেদের করে নিয়েছে ক্লাবটি। লেস্টার সিটিতে ২১ বছরের অধ্যায়ের পর শেফিল্ডে তার স্থায়ী ঠিকানা বদল যেন নতুন এক ফুটবল অধ্যায়ের শুরু!
ফেরার পর প্রথম ম্যাচেই সেই অধ্যায়ের শুরুটাও হলো নাটকীয়তায় ভরা। প্রথম মিনিটে গোল হজম, ব্যক্তিগত ভুলের ছায়া, বিরতির আগে সুযোগ নষ্ট-সবকিছুর পরও শেষ পর্যন্ত জয়!
মতামত দিন